"পৃথিবীতে একসময় ‘বাবা’-র ধারণা ছিলো না। সন্তান জন্মদানে পুরুষের যে কোনো ভূমিকা থাকতে পারে, এ ব্যাপারটিই মানুষ জানতো না। মানুষের সভ্যতা মূলত মায়ের সভ্যতা। ট্রোবিয়ান্ডরা ভাবতো, মেয়েদের ভেতর ‘ব্যালোমা’ নামক ভূত ঢোকার কারণে সন্তান জন্ম হয়।
ব্যালোমাটা কখন ঢোকে? যখন মেয়েরা একটু গভীর পানিতে গোসল করতে নামে, তখন। কোনো মেয়ে যদি বলতো, আমাকে মাছে কামড়িয়েছে, তাহলে সমাজ ধরে নিতো, তার ভেতর ব্যালোমা ঢুকেছে; কিছুদিনের মধ্যেই পেট ফুলে উঠবে। কিন্তু ব্যালোমা কেবল ওই মেয়েদের পেটেই সহজে ঢুকতো, যাদের সাথে ছেলেদের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা থাকতো।
মালিনোস্কি যখন অবিবাহিত এক মেয়ের ঘরে বাচ্চা দেখে জিগ্যেস করেছিলেন, শিশুটির বাবা কে? তখন ট্রোবিয়ান্ডরা প্রশ্নটি বুঝতে পারে নি। তবে বুঝিয়ে বলার পর উত্তর এসেছিলো, বাচ্চা হওয়ার জন্য তো বাবার প্রয়োজন নেই। বাচ্চা দিয়েছে ব্যালোমা। মেলানেশিয়ানরা বলতো, বিবাহিতদের বাচ্চা স্বামীর কারণে হলেও অবিবাহিতদের বাচ্চা হয় খাবারের কারণে। কিছু নির্দিষ্ট খাবার খেলে মেয়েরা গর্ভবতী হয়।
অর্থাৎ স্বামীর যে-গুরুত্ব বর্তমান সমাজে আছে, তা মানুষের সমাজে দীর্ঘকাল ছিলো না। এমনকি সব স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতো না। অনেকেই বিয়ের পর নিজ নিজ মায়ের সাথে থাকতো। সন্তান ছিলো এক্সক্লুসিভলি মায়ের সম্পত্তি। তোমার বাবা কে, এ প্রশ্ন মানুষ করতো না। বহু স্বামী তার স্ত্রীর সাথে লুকিয়ে মেলামেশা করতো। পরিবার ছিলো মা ও ভাইকেন্দ্রিক। স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনের চাইতে ভাই-বোনের বন্ধন অধিক শক্তিশালী ছিলো। সন্তানের উপরও স্বামীর চেয়ে ভাইয়ের কতৃর্ত্ব বেশি থাকতো।
দারিয়াস যখন ইন্তাফার্নেসের পরিবারকে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিলো, তখন ইন্তাফার্নেসের বউ স্বামীকে না বাঁচিয়ে ভাইকে বাঁচিয়েছিলো। সে দারিয়াসকে বলেছিলো, স্বামী মারা গেলে স্বামী পাবো, সন্তান মারা গেলে সন্তানও পাবো, কিন্তু ভাই মারা গেলে ভাই পাবো না। প্রাচীন সাহিত্যকর্মেও এর নজির আছে। অ্যান্টিগানি তার ভাইয়ের টানেই মৃত্যুবরণ করেছিলো, স্বামীর টানে নয়। স্বামী পলিয়াসের চেয়ে ভাই পলিনিসিস তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। খ্রিস্টান মিশনারিরা যখন মেলানেশিয়ায় ধর্ম প্রচারের জন্য গিয়ে বলেছিলো, ঈশ্বর হলেন যিশুর বাবা, তখন কথাটি কেউ বুঝে নি। কিন্তু যখন বলা হলো, ঈশ্বর হলেন যিশুর মামা, তখন সবাই বিষয়টি বুঝে ফেললো।
পিতৃত্ব ও স্বামীত্বের যে-বড়াই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোতে আছে, তা খুব রিসেন্ট ইনভেনশন। হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা স্বামীর কতৃর্ত্ব ছাড়াই পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে।"
.
—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
পৃষ্ঠা ১৬, বই: মূর্তিভাঙা প্রকল্প